পড়ুনসম্পাদনাইতিহাস

মূসক ৬.৩ চালান ও VAT ডকুমেন্টেশন বেসিক

সারকথা: VAT-নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিটি করযোগ্য বিক্রয়ে “মূসক ৬.৩” (VAT চালান/ট্যাক্স ইনভয়েস) ইস্যু করতে বাধ্য। এতে বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম-ঠিকানা-BIN, চালান সিরিয়াল নম্বর, পণ্য/সেবার বর্ণনা, পরিমাণ, একক দাম, মোট মূল্য ও VAT-এর হার ও পরিমাণ স্পষ্ট করে থাকতে হবে। এই চালানগুলোই পরে ক্রয়-বিক্রয় রেজিস্টার ও মাসিক VAT রিটার্নের ভিত্তি হয়, তাই ভুল বা অসম্পূর্ণ চালান পরে অডিট, ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট বা রিটার্নের হিসাবে সমস্যা করে।

এই গাইডটি ধরে নিচ্ছে আপনার ব্যবসা ইতিমধ্যে VAT-নিবন্ধিত (BIN আছে)। নিবন্ধন এখনো না করলে আগে BIN ও VAT নিবন্ধন গাইড দেখুন, ও নিবন্ধন আদৌ বাধ্যতামূলক কিনা বা টার্নওভার ট্যাক্সের আওতায় পড়েন কিনা যাচাই করতে কখন VAT নিবন্ধন বাধ্যতামূলকটার্নওভার ট্যাক্স ও VAT থ্রেশহোল্ড ব্যাখ্যা পড়ুন। এখানে আমরা নিবন্ধনের পরে দিনে দিনে যে ডকুমেন্টেশন করতে হয়, তা নিয়ে আলোচনা করব।

১. “মূসক” মানে কী, ও ৬.৩ ঠিক কোন ফর্ম

“মূসক” (মূল্য সংযোজন কর) হলো VAT-সংক্রান্ত সরকারি ফর্মগুলোর বাংলা নাম, যা VAT and Supplementary Duty Act, 2012 ও এর অধীনে জারি হওয়া VAT and Supplementary Duty Rules, 2016-এ নির্ধারিত। এই ফর্মগুলোর একটি নম্বরিং সিস্টেম আছে (৬.১, ৬.২, ৬.৩ ইত্যাদি), যেখানে প্রতিটি নম্বর ভিন্ন ভিন্ন কাজের জন্য।

NBR-এর নিজস্ব VAT কমপ্লায়েন্স গাইড স্পষ্ট করে বলে, একটি করদাতার দায়িত্বের মধ্যে আছে: “ক্রয়ের সময় VAT চালান (মূসক-৬.৩) চাওয়া ও বিক্রয়ের সময় তা ইস্যু করা।” অর্থাৎ মূসক ৬.৩ হলো সেই মূল ট্যাক্স চালান/ইনভয়েস, যা প্রতিটি করযোগ্য বিক্রয়ে ইস্যু করতে হয়।

সতর্কতা: ইন্টারনেটে অনেক ব্লগ/থার্ড-পার্টি সোর্সে মূসক ফর্মগুলোর নম্বর ও নাম নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায় (কিছু সোর্স ৬.১-কে চালান, কিছু সোর্স ৬.৩-কে রেজিস্টার বলে ফেলে)। নিচের তথ্য NBR-এর নিজস্ব পেজ ও একাধিক স্বাধীন সোর্সের সাথে মিলিয়ে যাচাই করা, তবু কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের আগে সবসময় হালনাগাদ অফিসিয়াল ফর্ম (vat.gov.bd বা স্থানীয় VAT সার্কেল থেকে) দেখে নিশ্চিত হয়ে নিন।

২. মূসক ৬.৩ চালানে যা যা থাকতে হবে

মূসক ৬.৩ চালানে সাধারণত এই তথ্যগুলো লিখতে হয়:

  • বিক্রেতার তথ্য: ব্যবসার নাম, ঠিকানা, ও BIN (Business Identification Number)।
  • ক্রেতার তথ্য: নাম, ঠিকানা, ও BIN (যদি ক্রেতাও VAT-নিবন্ধিত হয়)।
  • চালান সিরিয়াল নম্বর: ধারাবাহিক ও ইউনিক, একই নম্বর দুইবার ব্যবহার করা যাবে না।
  • ইস্যুর তারিখ ও সময়।
  • পণ্য/সেবার বর্ণনা: পরিমাণ ও একক (যেমন পিস, কেজি), ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে HS কোড।
  • একক দাম ও মোট মূল্য (নেট ভ্যালু)।
  • VAT-এর হার ও পরিমাণ: সাধারণ হার বা প্রযোজ্য নির্দিষ্ট/হ্রাসকৃত হার অনুযায়ী।
  • সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি (যদি পণ্যটি এর আওতায় পড়ে)।
  • ইস্যুকারী কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও প্রতিষ্ঠানের সিল/স্ট্যাম্প।

ব্যবহারিক পরামর্শ: চালানের সিরিয়াল নম্বর ও তারিখ নিয়ে অসতর্কতা সবচেয়ে বেশি সমস্যা করে, কারণ মাসিক রিটার্নের সময় এই সিরিয়ালগুলোর ধারাবাহিকতা যাচাই হতে পারে। ম্যানুয়ালি চালান লিখলে একটি নির্দিষ্ট নাম্বারিং সিস্টেম মেনে চলুন ও কোনো নম্বর স্কিপ বা রিপিট করবেন না।

৩. কে ইস্যু করবে, কখন ইস্যু করবে

যেকোনো VAT-নিবন্ধিত বিক্রেতা প্রতিটি করযোগ্য বিক্রয়ের সময় (পণ্য সরবরাহ বা সেবা প্রদানের সময়) মূসক ৬.৩ ইস্যু করবেন, নগদ হোক বা বাকিতে। ক্রেতা যদি নিজেও VAT-নিবন্ধিত হন ও ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট নিতে চান, তাহলে ক্রয়ের সময় সঠিক মূসক ৬.৩ চাওয়া তার নিজের দায়িত্ব, কারণ সঠিক চালান ছাড়া ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের দাবি বাতিল হতে পারে।

বড় টার্নওভারের ব্যবসাগুলোর জন্য NBR ক্রমান্বয়ে ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (EFD) বা NBR-অনুমোদিত সফটওয়্যার দিয়ে চালান জেনারেট করা বাধ্যতামূলক করছে। নির্দিষ্ট টার্নওভার সীমা সময়ে সময়ে পরিবর্তন হতে পারে, তাই আপনার ব্যবসা এই বাধ্যবাধকতার আওতায় পড়ে কিনা তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় VAT সার্কেল বা একজন VAT কনসালট্যান্টের সাথে যাচাই করে নিন।

৪. মূসক ৬.৩-এর সাথে সম্পর্কিত অন্য মূসক ফর্মগুলো

ছোট ব্যবসা চালাতে গিয়ে মূসক ৬.৩ ছাড়াও আরও কয়েকটি ফর্মের নাম শুনতে পাবেন। কোনটা কী কাজে লাগে তা মোটামুটি জেনে রাখা ভালো, যদিও প্রতিটির বিস্তারিত ব্যবহার এই গাইডের আওতার বাইরে:

  • মূসক ৬.১ (ক্রয় রেজিস্টার/Purchase Book): মাস জুড়ে সব ক্রয় লেনদেনের হিসাব, যা মূসক ৬.৩ চালানের ভিত্তিতে রাখা হয়।
  • মূসক ৬.২ (বিক্রয় রেজিস্টার/Sales Book): মাস জুড়ে সব বিক্রয় লেনদেনের সমন্বিত হিসাব।
  • মূসক ৬.৫ (মাল স্থানান্তরের চালান): এক শাখা/গুদাম থেকে অন্য শাখায় পণ্য পাঠালে (বিক্রয় না হয়ে অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর হলে) ব্যবহৃত হয়।
  • মূসক ৬.৬ (VAT ডিডাকশন সার্টিফিকেট): সাপ্লায়ারের কাছ থেকে উৎসে VAT কেটে নেওয়া হলে এই সার্টিফিকেট ইস্যু করতে হয়।
  • মূসক ৬.৭ ও ৬.৮ (ক্রেডিট নোট ও ডেবিট নোট): বিক্রয় ফেরত, ছাড় বা চালানের ভুল সংশোধনের জন্য।
  • মূসক ৬.১০: একক চালানে বড় অঙ্কের ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য আলাদা করে নথিভুক্ত করার ফর্ম।
  • মূসক ৯.১: মাসিক VAT রিটার্ন, যেখানে মূসক ৬.১/৬.২ রেজিস্টারের হিসাব জমা দিতে হয়। মাসিক রিটার্ন জমার পুরো প্রক্রিয়ার জন্য দেখুন BIN/VAT নিবন্ধনের পর মাসিক রিটার্ন ওয়ার্কফ্লো

মূল কথা হলো, মূসক ৬.৩ চালানগুলোই ৬.১ ও ৬.২ রেজিস্টারে যোগ হয়, ও সেই রেজিস্টারের যোগফলই মূসক ৯.১ রিটার্নে রিপোর্ট হয়। শুরু থেকে চালান ঠিকঠাক না রাখলে মাস শেষে রিটার্নের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যায়।

সাধারণ ভুল

  • মুখে মুখে বলে বা শুধু সাধারণ রসিদ (ক্যাশ মেমো) দিয়ে বিক্রি করা, মূসক ৬.৩ ফরম্যাটে চালান না দেওয়া।
  • চালানে ক্রেতা/বিক্রেতার BIN ভুল লেখা বা বাদ দেওয়া, যা পরে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট বা অডিটে সমস্যা করে।
  • চালান সিরিয়াল নম্বর ধারাবাহিক না রাখা, বা একই নম্বর একাধিকবার ব্যবহার করা।
  • মূসক ৬.১/৬.২ রেজিস্টার নিয়মিত আপডেট না করে মাস শেষে একসাথে সাজানোর চেষ্টা করা, যাতে ভুল থেকে যায়।
  • চালানের কপি ও রেজিস্টার পর্যাপ্ত সময় ধরে সংরক্ষণ না করা। VAT রেকর্ড সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে সংরক্ষণ করতে হয়, তাই নির্দিষ্ট সংরক্ষণ মেয়াদ একজন VAT কনসালট্যান্টের সাথে নিশ্চিত করে নিন।

চেকলিস্ট

  • প্রতিটি করযোগ্য বিক্রয়ে মূসক ৬.৩ ফরম্যাটে চালান ইস্যু হচ্ছে
  • চালানে বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম, ঠিকানা ও BIN ঠিকমতো আছে
  • চালান সিরিয়াল নম্বর ও তারিখ ধারাবাহিক ও ইউনিক
  • VAT-এর হার ও পরিমাণ ঠিকমতো হিসাব করা আছে
  • মূসক ৬.১ (ক্রয়) ও ৬.২ (বিক্রয়) রেজিস্টার নিয়মিত আপডেট হচ্ছে
  • চালান ও রেজিস্টারের কপি নিরাপদে ও পর্যাপ্ত সময় ধরে সংরক্ষিত আছে

পরবর্তী পদক্ষেপ

চালান ঠিকঠাক রাখার পর পরবর্তী ধাপ হলো এই তথ্য দিয়ে মাসিক রিটার্ন জমা দেওয়া, দেখুন BIN/VAT নিবন্ধনের পর মাসিক রিটার্ন ওয়ার্কফ্লো। VAT-নির্দিষ্ট ডকুমেন্টেশনের বাইরে সাধারণ হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা গড়তে দেখুন অডিট, হিসাব ও বুককিপিং সেটআপ। এখনো VAT নিবন্ধন না করলে আগে BIN ও VAT নিবন্ধন গাইড থেকে শুরু করুন। নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য সবসময় একজন VAT কনসালট্যান্ট বা স্থানীয় VAT সার্কেলের সাথে যাচাই করে নিন।

প্রাসঙ্গিক সূত্র